North Indian Samossa vs Bengali Singara
North Indian Samossa vs Bengali Singara
আমাদের একটা খুব প্রচলিত ধারণা আছে বাঙালির কাছে যা সিঙ্গাড়া, অবাঙালীদের কাছে তাই-ই সামোসা। কিন্তু সিঙ্গাড়া আর সামোসার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। এই যেমন, সিঙাড়ার বাইরের আবরণে একটা স্তরের ছাপ লক্ষ্য করা যায় এবং আবরণ বাঙ্গালীদের মনের মত নরম হয়, যেখানে সামোসায় বাইরের আবরণ হয় অনেক মুচমুচে। আরেকটা পার্থক্য বাইরে থেকে খুব সহজেই বোঝা যায়। সেটা হল, সিঙাড়ার আকার সামোসার থেকে ছোটো এবং আকার তিনকোনা বলের মতন। অপরদিকে সামোসার তিনকোনা বেশ সোজা এবং স্পষ্ট। বাইরের কথা তো হল, এবারে ভেতরের কথায় আসি। সিঙাড়ায় যে আলুর পুর থাকে সেখানে আলু চটকে পুর বানানো হয় না সামোসার মত। সিঙাড়ার পুরে আলু ছোটো ছোটো করে কাটা থাকে। যদি স্বাদের দিক থেকে দেখি তাহলে তুলনামূলকভাবে সিঙ্গাড়াতে সামোসার থেকে কম ঝাল থাকে।
![]() |
| Samosa Source: Times of India |
এবারে আসি সিঙ্গাড়া আর সামোসার ইতিহাসে। সামোসা কিন্তু সিঙ্গাড়ার থেকে অনেক পুরোনো। উৎস সেই মধ্যপ্রাচ্য, মানে আরব। তখন অবশ্য নাম ছিল Sambossa। সামোসার উল্লেখ আমরা ইতিহাসে সর্বপ্রথম পাই নবম শতাব্দীর পারস্যের কবি Ishaq al-Mawsili-র লেখায়। ইরানীয় ইতিহাসবিদ Abolfazl Beyhaqi(995-1077) , তার বই Tarikh-e Beyhaghi -তেও সামোসার উল্লেখ করেন। আর সম্পূর্ণ রন্ধন প্রণালী পাওয়া যায় ১০-১৩ শতাব্দীর রান্নার বইয়ে Sanbusak / Sanbusaq / Sanbusaj নামে, এই সবকটি নামই পারস্যের Sanbosag থেকেই সৃষ্ট। ষোড়শ শতাব্দী অবধি ইরানে এর জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। কিন্তু বিংশ শতক আসতে আসতে অজানা কারনে এর জনপ্রিয়তা কমতে কমতে বিশেষ কিছু অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে গেল। এখন প্রশ্নটা হল, মধ্য প্রাচ্যের এই মুখরোচক খাবার ভারতে আসলো কি করে!!! পারস্যের বেশিরভাগ খাবার মোঘলদের দিল্লী জয়ের মাধ্যমে ভারতে আসলেও সামোসা মধ্য এশিয়া থেকে আসে তখনকার ব্যবসায়ীদের হাত ধরে। দিল্লীর সুলতান রাজত্বের সময় তাদের সভাকবি Amir Khusro (1253-1325)-র লেখা থেকে জানতে পারি তখনকার বিত্তবান মানুষের পছন্দের খাবার ছিল এই সামোসা। বানানো হত পিয়াঁজ, মাংস এবং ঘি দিয়ে। চতুর্দশ শতকের বিখ্যাত পর্যটক Ibn Battuta-র লেখা থেকে আমরা জানতে পারি মুহম্মদ বিন তুখলকের খাদ্যতালিকায় মাংসের সামোসা ছিল পোলাওয়ের ঠিক আগেই। ষোড়শ শতকের Ain-i-Akbari-তে কুতাবের রন্ধন প্রণালীর বর্ণনা দেবার সময় এটাও উল্লেখ করা হয় যে, হিন্দুস্তানের মানুষ এই কুতাবকে Sanbusah বলেই চেনে।
![]() |
| Singara Source: dailyfrost.com |
এবারে আসি বাংলার সিঙ্গাড়ার কথায়। বাঙালীর সিঙ্গাড়ার উৎসটা বেশ মিষ্টি। সালটা ১৭৬৬, পঞ্চাশ ঊর্ধ ভোজনরসিক কৃষ্ণনগরের রাজা মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র তখন মধুমেহ রোগে আক্রান্ত। রাজার খাবারের তালিকাটা মোটামুটি এরকম ছিল, সকালে গাওয়া ঘি-য়ে ভাজা লুচি। দুপুরে দ্বাদশব্যঞ্জনের সাথে ভাত, পাঁচরকমের মাছ এবং মাংসের সাথে পোলাও। বিকেলে ফল এবং মিষ্টি। রাতে নিরামিষ, অষ্টব্যঞ্জনের সাথে লুচি। রাজা প্রতিটা পদ খাবার পর হাত ধুয়ে পরের পদটি খেতেন, যাতে প্রত্যেকটি খাবারের স্বাদ আলাদা আলাদা করে আস্বাদন করা যায়। এহেন ভোজনরসিক মানুষ একদিন তার রাজপাচককে হুকুম দিলেন এভাবে এত পদ খেতে লেগে রাজকার্যে বিলম্ব হয়, তাই তিনি লুচি এবং কেবলমাত্র তরকারি সহযোগে আহার করবেন। একে মধুমেহ তারওপর রাজকার্যের চাপে রাজা একেবারে পুরো ডায়েটে চলে গেলেন। কিন্তু মুশকিলটা হল, রান্নাঘর থেকে লুচি ভেজে রাজসভায় আনতে আনতে ঠান্ডা হয়ে যায়। প্রজাবাৎসল রাজার তখন রাগে রক্তচক্ষু। রাগ ঠান্ডা করতে হালুইকর বুদ্ধি দিলেন মিষ্টি খাওয়ানোর। ব্যস, যেই না বলা.... রাজাকে মারার পরিকল্পনা করার দায়ে প্রায় গরদান যায় হালুইকরের। স্বামীকে বাঁচাতে এগিয়ে এলেন হালুইকরের স্ত্রী। তিনি রাজাকে বললেন তিনি এমন লুচি বানাতে পারেন যেটা আধঘণ্টা পরও গরম থাকবে এবং তিনি রাজাকে সতর্ক করলেন একটু রয়ে সয়ে ঠান্ডা করে খেতে, না হলে জিভ পুড়ে যাবার আশঙ্কা আছে। রাজপাচক তখন আবার আলুর তরকারি বানিয়ে ময়দা মেখে লেচি বানিয়ে রেখেছে। হুকুম আসলেই ভেজে সঙ্গে সঙ্গে পাঠাতে হবে। সেই কাঁচা ময়দার লেচির ভেতরে তরকারির পুর ভরে সব গুছিয়ে রাখেন। হুকুম আসার সাথে সাথে গরম ঘিয়ে ভেজে পরিবেশিত হয়েছিল আর তারসাথে রচিত হয়েছিল আরেক ইতিহাস। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র এরকম এক খাবার দেখে স্তম্ভিত। হালুইকরের স্ত্রী রাজাকে জানান খাবারের নাম সম্ভুজা বা সমভূজা। তিনি রাজাকে অনুরোধ করেন খাবারটি একটু চেখে দেখে বলুন সেটা গরম আছে কিনা এখনও এবং তার স্বাদ কেমন। রাজা বাকরুদ্ধ হয়ে ছিলেন সেদিন। কথা না বলে তিনি তিনছড়া মুক্তোর হার গলা থেকে খুলে দিয়েছিলেন হালুইকরের স্ত্রীকে। পরের বছর দোলপূর্ণিমায়, রাজা কৃষ্ণচন্দ্র বাইশটা সুসজ্জিত হাতিতে করে বাইশটি সোনার থালায় বাইশ হাজার সিঙ্গাড়া ভেট পাঠান উমিচাদের কাছে। এমন একজন ইতিহাস স্রষ্টার নামটা এবার বলি, উড়িষ্যার বাসিন্দা গুনীনাথ হালুইকরের ষষ্ঠপুত্র গিরিধারী হালুইকরের স্ত্রী ধরিত্রী বেহারা।



Comments
Post a Comment